মো. ফয়জুর রহমান: রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বার্তা নিয়ে প্রতি বছর রমজান মাস আগমন করে মুমীনদের মাঝে। জীবনে নানা শিক্ষা ও গুণাবলি অর্জনে এ মাসের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সাম্য, মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ থাকার উপযুক্ত সময় পবিত্র রমজান মাস।
![]() |
রমজান মাসে মুসলমানরা যেসব শিক্ষা গ্রহণ করে |
ইসলামে নির্দেশিত খোদাভীতি, আত্মশুদ্ধি, আত্মসংযম, ধৈর্য্য ও সহিষ্ণুতা চর্চার উন্নতি সাধন হয় পবিত্র এ মাসে। ইসলামের যেসব বিধিবিধান সরাসরি মানুষকে সংযত, পরোপকারিতা, মনুষ্যত্ব ও আধ্যাত্মিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে রমজান মাসের সিয়াম সাধনা তন্মধ্যে অন্যতম।
খোদাভীতি:
মহান আল্লাহ তায়ালার ভয় তথা খেদাভীতি অর্জনের মোক্ষম সময় হলো পবিত্র রমজান মাস। মহান আল্লাহর বাণী- "তোমাদের উপর সাওম ফরজ করা হয়েছে, যেমনি ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যাতে তোমরা (তাকওয়া) খোদাভীতি অর্জন করতে পারো।" সততা ও ন্যায়নিষ্ঠার কারণে রোজাদারের মধ্যে খোদাভীতি সৃষ্টি হয় এবং সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সব ধরনের পানাহার, যাবতীয় অশ্লীল কাজ, মিথ্যা কথা প্রভৃতি খারাপ ও নিন্দনীয় অপকর্ম থেকে নিজেকে বিরত রাখেন। তাই সিয়াম সাধনা বা রোজাকে বলা হয় খোদাভীরুতা লাভের সোপান। হাদিসে কুদসিতে মহান আল্লাহতায়ালা বলেন, 'মানুষের প্রতিটি কাজ তার নিজের জন্য, কিন্তু রোজা এর ব্যতিক্রম। রোজা শুধু আমার জন্য, আমিই এর প্রতিদান দেব।' যেহেতু মহান আল্লাহই অন্যান্য বিধানের মধ্যে রোজাকে নির্দিষ্ট করেছেন তাই এ ইবাদতে সবচেয়ে বেশি খোদাভীতি অর্জিত হয়ে থাকে।
আত্মসংযম:
রমজান মাস মূলত আত্মসংযমের মাস। প্রকৃত রোজাদাররা মিথ্যাচারিতা, অহেতুক কথা বলা, গিবত ও কটু বাক্য হতে জিহ্বাকে সংযত রাখে। নিজ কামনা-বাসনাকে সংযত করে ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কষ্ট সহ্য করার মতো সক্ষমতাও অর্জন করে থাকে। রিপুর তাড়নাকে পরিত্যাগ করে জিহ্বা ও মনের চাহিদাকে নিয়ন্ত্রণে রাখেন রোজাদার ব্যক্তি। এমনকি দৈহিক আকাঙ্ক্ষা ও প্রেরণাকে সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় পবিত্র রমজান মাসে। রোজার স্বাদ অনুভূত করতে হলে হারাম জিনিস দেখা, নিষিদ্ধ কথা শ্রবণ করা ও হারাম কাজ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত রাখতে হয়। সংযত ও নিষ্ঠাবান হওয়ার মহান শিক্ষায় অনুপ্রানিত হয়ে রোজাদার ব্যক্তি সকল অন্যায় ও অপকর্ম থেকে বিরত হয়ে সংযমী জীবনে উদ্বুদ্ধ হয়ে থাকেন। এভাবে রোজা মানুষকে সংযমী মনোভাব হিসেবে গড়ে তোলার অতুলনীয় শিক্ষা দেয়।
আত্মশুদ্ধি:
আত্মশুদ্ধি মুমীন জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষঙ্গ। আত্মিক উন্নতি ছাড়া মুমিন নিজেকে নফসের ধোঁকা থেকে, শয়তানের কবজা থেকে হেফাজত রাখতে পারে না। আর আত্মশুদ্ধি অর্জনের উপযুক্ত সময় পবিত্র রমজান মাস। রমজান শব্দটি এসেছে আরবি শব্দের ‘রমজ’ মূল ধাতু থেকে। এর অর্থ জ্বালিয়ে দেওয়া, পোড়ানো ও ভস্ম করে দেওয়া। বান্দা যেহেতু এই মাসে তার কুপ্রবৃত্তিসমূহ জ্বালিয়ে আত্মশুদ্ধি অর্জন করে তাই একে রমজান বলে। রমজান হল উপবাস, প্রার্থনা ও ব্যক্তিগত প্রবৃত্তি থেকে শুদ্ধাচারের নাম। ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত মুসলমানরা আত্মাকে শুদ্ধ করার ও ইসলামের নির্দেশনা অনুশীলন করার সুযোগ লাভ করে এই মাসে। রমজান মূলত মানুষকে সংযত, আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে। প্রকৃতপক্ষে সাওম মানুষকে আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে মানবীয় গুণাবলি শিক্ষা দেয়। ফলে রোজাদারগণ লোভলালসা পরিহার করে দুনিয়া ও আখিরাতের শান্তি অর্জন করতে পারে।
নিয়মানুবর্তিতা:
রোজা মানুষকে শৃংখলিত জীবনের দিকে পথ-নির্দেশ করে। মুমিনের জীবনকে নিয়মানুবর্তিতার চাদরে আকড়ে নিতে রমজানের ভূমিকা অনন্য। কেননা সিয়াম, নিয়মানুবর্তিতা ও তাকওয়া এ তিনটি বিষয় অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। তাকওয়ার পূর্বশর্তই হল নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে সিয়াম পালন করা। রোজায় মানুষ সময়মতো সাহরি ও নির্দিষ্ট সময়ে ইফতার করে থাকে। এছাড়াও সময়মতো মসজিদে উপস্থিতি, নির্দিষ্ট সময়ে জামাআতে নামাজ আদায় কিংবা সময়মতো তারাবিহ আদায় করতে হয়। রমজান মাস মুমিনদের নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট কাজগুলো করতে শেখায়। এভাবে রোজাদার ব্যক্তি সময়ানুবর্তিতার অনুশীলন করে নিয়মানুবর্তিতা অর্জন করে থাকে।
ধৈর্য্য:
আরবি ‘সবর’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ধৈর্যধারণ, সহনশীলতা, পরমতসহিষ্ণুতা, সহ্য করা প্রভৃতি। মাসব্যাপী সিয়াম সাধনায় রোজাদার ব্যক্তি সর্বাবস্থায় ধৈর্যধারণ ও সহনশীলতা প্রদর্শনের সুযোগ লাভ করে থাকেন। কাজেকর্মে ও চলাফেরায় ধৈর্যধারণের মাধ্যমেই সিয়াম সাধনা পরিপূর্ণ হয়। রমজান মাসে রোজাদার ব্যক্তি কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ধৈর্য ধারণ করে সব ধরনের পাপকাজ, পানাহার ও ইন্দ্রিয় তৃপ্তি থেকে বিরত থাকেন। এ মাসে আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের কঠোর ত্যাগ, উদারতা, সততা, ধৈর্য্য ও সহনশীলতা প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন। তাই এ মহান মাসটির পরিচয় তুলে ধরে ধৈর্য-সংযমের গুরুত্ব প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘এটা সবর বা ধৈর্যের মাস, আর সবরের বিনিময় হচ্ছে জান্নাত।’
মনুষ্যত্ব:
মানবীয় উত্তম গুণাবলির অন্যতম হলো মনুষ্যত্ব অর্জন। মানুষ যেন প্রকৃত মানুষ হতে পারে এবং তার মধ্যে মনুষ্যত্ব যেন পূর্ণ মাত্রায় জাগ্রত হয় এরূপ নির্দেশনা রয়েছে ইসলামের বিধানে। মানুষকে চিরমুক্তির মোহনায় পৌঁছাতে মনুষ্যত্ব বিকাশের বিকল্প নেই। মুমিনদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে রমজান মাসের বিকল্প নেই। মানুষকে পথভ্রষ্ট করার জন্য শয়তান ব্যক্তির নফস বা প্রবৃত্তির ওপর কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ প্রভৃতি রিপু দ্বারা প্রভাব বিস্তার করে। তাই আল্লাহ তাআলা পবিত্র রমজান মাস দান করেছেন বান্দার মানসিক উৎকর্ষ সাধন ও মনুষ্যত্ব অর্জনের জন্য। আর এজন্য পবিত্র রমজানে অভিশপ্ত শয়তানকে শৃঙ্খলিত করা হয়। কারণ, এতে শয়তান মানুষকে পাপকাজের প্রতি ধাবিত করতে পারে না। তবে মানবিক শয়তান কিংবা বাজে অভ্যাসের কারণে মানুষ মন্দকাজে লিপ্ত হতে পারে। মোদ্দাকথা শয়তানি সকল কুমন্ত্রণাকে উপেক্ষা করে প্রকৃত রোজাদারগণ মনুষ্যত্বের গুণাবলি অর্জনে সর্বদা প্রস্তুত থাকে।
পরোপকারিতা:
সমাজ জীবনে রোজাদার ধনী-গরিব ব্যক্তি মিলেমিশে ইবাদত করে একত্রে সমাজবদ্ধ হয়ে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করেন। প্রকৃত রোজাদার সমাজের কাউকে ঠকাতে বা কারো সঙ্গে প্রতারণা করতে পারেন না। প্রকৃত রোজাদার কখনো কারো অনিষ্ট, অকল্যাণ ও ক্ষতিসাধন করেন না। তাঁরা মাহে রমজানে সমাজের অসহায়, হতদরিদ্র, দুর্বল, পীড়িত, অসুস্থ, অনাথ ও ছিন্নমূল মানুষের খোঁজখবর রাখেন, তাদের খাওয়া-পরার ব্যবস্থা করেন, সেহরি-ইফতারের আয়োজন করেন এবং যথাসম্ভব সাধ্যানুযায়ী পরোপকারে ব্যস্ত থাকেন। ধনী-গরিব আপামর রোজাদার এভাবে রোজার মাসে অসাধারণ ত্যাগ-তিতিক্ষা অনুশীলনের মাধ্যমে ইসলামের সাম্য, মৈত্রী, ঐক্য ও পরোপকারীতায় উদ্বুদ্ধ হন। একজন রোজাদার ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি সর্বদা বিপদগ্রস্ত অসহায় মানুষের প্রতি পারস্পরিক সহানুভূতি প্রকাশ করেন।
ভ্রাতৃত্বের বন্ধন:
মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'প্রত্যেক মুমীন পরস্পর ভাই ভাই।' আর এ ভ্রাতৃত্বের বন্ধন মুসলিম উম্মাহর অন্যতম নিদর্শন। ইসলামের প্রতিটি বিধানেই এ বন্ধন দৃঢ় হবার সুযোগ রয়েছে। বরকতময় রমজান মাসে মুসলমানদের মাঝে সবচেয়ে বেশি ভ্রাতৃত্বের বন্ধন তৈরি হয়। রমজান মাসে মুসলমানরা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও তারাবির নামাজ মসজিদে জামায়াতের সাথে আদায় করে থাকেন৷ অন্যান্য মাসের চেয়ে এ মাসে মুসলমানদের মসজিদে উপস্থিতি বেশি লক্ষণীয়। সমাজজীবনে ধনী ও গরীবরা মিলেমিশে একই কাতারে নামাজ আদায় করে থাকে। ফলে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে পবিত্র রমজান মাস। অপরদিকে রমজান মাসে ধনীরা তাদের সম্পদ থেকে গরীবের যাকাত ও ফিতরা প্রদান করে থাকে এতে করে ধনী-দরিদ্রের মাঝে তৈরি হয় নিবিড় সম্পর্ক। পুরো রমজানের সকল আনুষ্ঠানিকতায় রয়েছে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন দৃঢ় হবার অন্যতম সুযোগ।
ইবাদতের প্রশিক্ষণ:
রমজান মূলত ইবাদত-বন্দেগির প্রশিক্ষণের মাস। রমজান মাসে ইবাদত বন্দেগির অত্যধিক অনুশীলন করে বাকি এগারো মাস এ বন্দেগির ধারা অব্যাহত রাখার সুযোগ লাভ করে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। রোজাদারগণ ইবাদতের মাধ্যমে রমজানকে কাজে লাগাতে পারলে এ রমজানই জীবনের সফলতা বয়ে নিয়ে আসবে। রমজানের প্রতিটি ইবাদতের জন্য ন্যূনতম ৭০ গুণ বেশি সওয়াবের ঘোষণা রয়েছে। আর এ অধিক পুণ্যের আশায় ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা পুরো রমজানে ইবাদত বন্দেগিতে ব্যস্ত থাকেন। এ মাসে প্রশিক্ষণ নিয়ে বান্দা নিজের মধ্যে মানবীয় গুণাবলীর বিকাশ ঘটায়।
সূত্র: /সেবা হট নিউজ: সত্য প্রকাশ্যে আপোষহীন

খবর/তথ্যের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, সেবা হট নিউজ এর দায়ভার কখনই নেবে না।